আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মৌলভীবাজার–৪ (শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ) আসনে চলছে তুমুল আলোচনার ঝড়। কে পাবেন বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’—সাবেক পৌর মেয়র মহসিন মিয়া মধু, না কি প্রবীণ নেতা হাজী মুজিবুর রহমান চৌধুরী—এই প্রশ্ন এখন স্থানীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
রোববার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মৌলভীবাজার জেলার চার আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। উপস্থিত ছিলেন সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক জি. কে. গউছসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, খুব শিগগিরই একক প্রার্থীকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দেওয়া হবে।
বৈঠকে হাজী মুজিব ও মধু মিয়া নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও মাঠপর্যায়ের জনপ্রিয়তা তুলে ধরেন মহাসচিবের সামনে। দলের একাধিক সূত্র জানায়, দুই নেতারই এলাকায় শক্ত অবস্থান রয়েছে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মাঠপর্যায়ের জরিপে গুরুত্ব দিচ্ছে।
মৌলভীবাজার–৪ আসন সিলেট বিভাগের একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনের আয়তন ৮৫১ বর্গকিলোমিটার, ভোটার ৫ লাখ ৫ হাজার ৮২০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪০ হাজার ৬৭৬, নারী ২ লাখ ৪১ হাজার ৯০৪ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ জন। নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ২৩ হাজারের বেশি তরুণ ভোটার, যাদের বড় অংশ চা-বাগান এলাকার শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী।
এই আসন চা শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় হিন্দু-সংখ্যালঘু ও চা-শ্রমিক ভোটাররা এখানে নির্ধারক ভূমিকা রাখেন। ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগ বরাবরই প্রভাবশালী থাকলেও বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতিবারই শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
হাজী মুজিবুর রহমান চৌধুরী ২০০১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসেন। ২০০৮ ও ২০১৮ সালে বিএনপির প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ২০ বারেরও বেশি কারাভোগ করেছেন। তাঁর ছোট ভাই, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, রাজনৈতিক কারণে মৃত্যুবরণ করেন। অন্যদিকে মহসিন মিয়া মধু চারবারের নির্বাচিত পৌর মেয়র এবং ১৯৮৪ সাল থেকে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। জনপ্রতিনিধি হিসেবে চা-শ্রমিক, সংখ্যালঘু ও শহরাঞ্চলের ভোটারদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্য।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ বর্তমানে শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে। দীর্ঘদিনের সংসদ সদস্য ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ কারাগারে, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ভানু লাল রায়সহ একাধিক শীর্ষ নেতা গ্রেফতার। তৃণমূল পর্যায়ে তেমন তৎপরতা নেই, ফলে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম এখন দৃশ্যমানভাবে সক্রিয়।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী থেকে অ্যাডভোকেট আব্দুর রব এবং নবগঠিত এনসিপির তরুণ নেতা প্রীতম দাশ মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তাঁরা চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা পেতে কাজ করছেন। জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র দলগুলো এখনো সংগঠিত হতে পারেনি।
স্থানীয় রাজনীতিতে এখন প্রধান আলোচনার বিষয়—চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা কে পাবে। বিশ্লেষকদের মতে, শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ আসন এবারের নির্বাচনে দেশের সবচেয়ে অনিশ্চিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর একটি হতে যাচ্ছে। চা-বাগানের ভোটারদের মন জয় করাই নির্ধারণ করবে—ধানের শীষের প্রতীকটি কার হাতে উঠবে।
মন্তব্য করুন